ইসলামিক ওয়ার্লড নিউজ

পৃথিবীর কেন্দ্র হলো পবিত্র ‘কাবা শরীফ’ !

সৌদি আরবের মক্কায় অবস্থিত ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র স্থান ‘মসজিদুল হারাম’। এই মসজিদের কেন্দ্রে রয়েছে পবিত্র কাবা শরীফ। মুসলিমরা কাবার উপাসনা করে না, তারা উপাসনা করে এক ঈশ্বর আল্লাহ্’র। আর কাবা সেই বিশ্বাসেরই প্রতিনিধিত্ব করে।

বিশ্বব্যাপী মুসলিমরা প্রতিদিন পাঁচবার এই ঘরের দিকে ফিরে প্রার্থনা করেন। আমাদের এই প্রতিবেদনে জানাবো পবিত্র কাবা ঘর সম্পর্কে কিছু অজানা ও বিস্ময়কর তথ্য। পৃথিবীর প্রথম ইবাদতের স্থান কাবা শরীফ। পবিত্র কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী মুসলিম

জাতির পিতা ইব্রাহিম (আ) ও তার পুত্র ইসমাঈল (আ) একত্রে কাবা নির্মাণ করেন। ইসলাম ধর্ম শুরু হওয়ার বহু আগে থেকে কাবা -কে কেন্দ্র করে একটি নির্দিষ্ট এলাকা ছিল অত্যন্ত পবিত্র ও নিরাপদ স্থান। এখানে শিকার করা, গাছ কাকা, মারামারি করা, বা মানুষ হত্যার মত কাজ ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাই এই

মসজিদকে বলা হয় মসজিদ-আল-হারাম। আরবি ভাষায় ‘হারাম’ শব্দটির একাধিক অর্থ রয়েছে। হারামের একটি অর্থ নিষিদ্ধ, আরেকটি অর্থ পবিত্র। তবে মসজিদ আল হারাম শব্দের নিষিদ্ধ বা পবিত্র ছাড়াও আরো কোন অন্তর্নিহিত অর্থ থাকতে পারে।

হযরত ইবরাহীম (আ) ও ইসমাইল (আ) কাবা ঘর নির্মাণ সম্পন্ন করার পর একটি পাথর বসানোর জায়গা থাকা ছিল। ইবরাহীম (আ) তার পুত্রকে পাঠান এখানে বসানোর মত একটি পাথর খুঁজে আনতে। তখন আল্লাহ্’র আদেশে ফেরেশতা জিব্রাইল (আ) জান্নাত থেকে একটি পাথর নিয়ে আসেন। বলা হয়ে থাকে,

পাথরটি যখন পৃথিবীতে এসেছিল তখন এর রং ছিল সম্পূর্ণ সাদা। কিন্তু দিনে দিনে মানুষের পাপ শুঁষে নিয়ে পাথরটি কালো রং ধারণ করেছে। কাবা শরীফের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত এই পাথরের নাম ‘হাজরে আসওয়াদ’।কাবা ঘর বহুবার পুনঃনির্মাণ ওর সংস্কার করা হয়েছে। তবে হযরত মুহাম্মদ (সা) নবুয়্যত

প্রাপ্তির কয়েক বছর আগে কাবার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। প্রায় ১০০ বছর পরপর কাবা ঘরের বেশ কিছু সংস্কার কাজ করা হয়। সর্বশেষ ১৯৯৬ সালের কাবা ঘরের ভিত্তি আগের চেয়ে মজবুত করা হয়। সেই সাথে নতুন ছাদ স্থাপন করা হয়

এবং বেশকিছু পাথর পরিবর্তন করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে আগামী কয়েক শত বছরে কাবাঘরে আর নতুন করে কোন সংস্কারের দরকার হবে না। বর্তমানে কাবা শরীফের উচ্চতা প্রায় ৫০ ফুট ;এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ ফুট ও প্রস্থ ৩৫ ফুট। আতীতে কাবা ঘরে দুইটি দরজা ও একটি জানালা ছিল। একটি দরজা এর ভেতরে

প্রবেশ করার জন্য, আরেকটি ভেতর থেকে বাইরে বের হওয়ার জন্য ব্যবহার করা হতো। কিন্তু বর্তমানে শুধু একটি দরজা রয়েছে এবং কোন জানালা নেই। কাবা ঘরের চারটি কোন কম্পাশের চারটি কাঁটা বরাবর রয়েছে। কাবা শুধু মুসলিমদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুই নয়, ভৌগোলিকভাবেও কাবাঘর পৃথিবীর কেন্দ্রে

অবস্থিত।পৃথিবীর ১৮০ কোটি মুসলিম প্রতিদিন পাঁচবার পবিত্র কাবার দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করে। হজ্জ্ব ও ওমরার সময় মুসলিমরা কাবার চারপাশে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে সাত বার প্রদক্ষিণ করে। যা ‘তাওয়াফ’ নামে পরিচিত। যে জায়গা জুড়ে তাওয়াফ করা হয় তাকে বলে ‘মাতাফ’। অবিশ্বাস্য হলেও

সত্য যে, কাবাকে প্রদক্ষিণ করা কখনই থেমে থাকে না। এই মুহূর্তেও কেউ না কেউ তাওয়াফ করছে। এমনকি অতীতে বন্যার সময়ও মানুষ সাঁতার কেটে কাবাকে প্রদক্ষিণ করেছে।বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের বিস্তারের কারণে সৌদি আরব ২০২০ সালের

২৭ ফেব্রুয়ারি বাইরের দেশ থেকে ওমরা পালন করতে আসার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এরপর ৫ মার্চ পূর্ণাঙ্গ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করার জন্য মক্কা ও মদিনার দুই পবিত্র মসজিদ মুসল্লিদের জন্য বন্ধ করা হয়। তারপরের দিন মসজিদ ও মাতাফ আবারও খুলে দেয়া হলেও মার্চের মাঝামাঝি কাবা শরীফে পাঁচ ওয়াক্ত

নামাজ, জুম্মার নামাজ এবং তাওয়াফ করার ব্যাপারেও আসে নিষেধাজ্ঞা। বাইরে থেকে মুসল্লিদের অংশগ্রহণ না থাকলেও কাবাঘর এবং মসজিদুল হারামের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও খাদেমরা মিলে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করতে থাকেন। তবে করোনা ভাইরাসের কারনেও কাবাকে প্রদক্ষিণ করা

একেবারে থেমে নেই। এসময় সৌভাগ্যবান কিছু মুসলিম তাওয়াফ করার সুযোগ পায়। মসজিদুল হারামের ভেতর ও ছাদের উপর দিয়ে সীমিত সংখ্যক লোক কাবাকে প্রদক্ষিণ করতে থাকেন। কাবা শরীফে মানুষের পদচারণা কমে যাওয়ার পর হঠাৎ করেই দেখা যায় আশ্চর্য এক ঘটনা। এক ঝাঁক পাখি কাবা ঘরের চারদিকে

তাওয়াফ করতে থাকে। উপস্থিত কেউ একজন তা স্মার্টফোনে ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করলে, ভিডিওটি ইন্টারনেটে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।কাবা শরীফের গুরুত্বপূর্ণ অলংকার এর উপরের কালো পর্দা, যার নাম ‘কিসওয়া’।

অনেকে একে কাবা শরীফের গিলাফ নামেও চেনে। মুসলিম বিশ্বের সেরা ক্যালিগ্রাফার এবং শিল্পীরা মূল্যবান এই আবরণ তৈরি করেন। রেশমের তৈরি কালো কাপড়ের উপর সোনা ও রুপার সুতা দিয়ে লেখা হয় পবিত্র কুরআনের আয়াত। এই গিলাফ তৈরি করতে ৬৭০ কেজি রেশম এবং ১৫ কেজি স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়। এই সিল্ক আসে ইতালি থেকে, এবং সোনা ও রুপার প্রলেপ দেওয়া সুতা

আসে জার্মানি থেকে। আধ্যাত্মিক বিচারে কিসওয়া অবশ্যই অমূল্য, কিন্তু এর বাজার মূল্য হিসাব করতে গেলে একটি কিসওয়া তৈরি করতে প্রায় ৫০ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়। কাবা শরীফের গিলাফ কালো ছাড়া অন্য কোন রং আমরা কল্পনাই করতে পারি না। কিন্তু অতীতে সবুজ, লাল এবং সাদা রঙের গিলাফ ব্যবহার করা হতো। আব্বাসীয় খিলাফতের সময় থেকে কালো রংয়ের

গিলাফের প্রচলন শুরু হয়। অতীতে একটি গিলাফের উপর আরেকটি নতুন গিলাফ বসানো হতো। একসাথে বহু গিলাফের ওজনের কারণে কাবা ঘরের উপর প্রচুর চাপ পরতো। তাই পরবর্তীতে শুধুমাত্র একটি গিলাফ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিবছর হজ্জ্বের মৌসুমে আরাফার দিনে গিলাফ পরিবর্তন করা হয়। এবং পুরনো গিলাফ ছোট ছোট অংশে কেটে বিভিন্ন

জাদুঘর এবং বিশিষ্টজনদের উপহার হিসেবে পাঠানো হয়।কাবা ঘরের ভেতরে কি আছে তা নিয়ে রয়েছে বহু জল্পনা-কল্পনা। অতীতে প্রতি সপ্তাহে দুইবার সকলের জন্য কাবাঘর খুলে দেয়া হতো। কিন্তু দিনে দিনে আগত মুসল্লির সংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়ায়, বর্তমানে বছরে মাত্র দুইবার কাবার দরজা খোলা হয়

;এবং কতিপয় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা এর ভেতরে প্রবেশ করেন। কাবা ঘরের দরজা খোলার দিন লক্ষ লক্ষ মুসলিম এর সামনে ভিড় করে এক ঝলক দেখার জন্য। কাবা ঘরের ভেতরে রয়েছে ছাদকে ধরে রাখার জন্য তিনটি স্তম্ভ। এর মাঝ বরাবর একটি টেবিল এবং সোনা ও রুপার তৈরি কিছু প্রদীপ ঝুলানো আছে। ভেতর

থেকে কাবা ঘরের ছাদের উপরের দিকটা কুরআনের আয়াত সম্বলিত সবুজ কাপড় দিয়ে মোড়া। কাবা শরীফের ছাদে ওঠার জন্য এর ভেতরে আরও একটি দরজা আছে। কাবার ভেতরে প্রায় ৫০ জন লোক নামাজ আদায় করতে পারবে। এটিই পৃথিবীর একমাত্র ঘর, যেখানে আপনি যেদিকে খুশি সেদিকে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে পারবেন।ইসলাম প্রচারিত হওয়ার আগে

থেকে কুরাইশ গোত্রের একাধিক পরিবার কাবা শরীফের দেখভাল করত। কিন্তু সকল পরিবার তাদের নিয়ন্ত্রণ হারালেও শুধুমাত্র ‘বনি সাইবা’ পরিবার তাদের কর্তৃত্ব বজায় রাখে। মক্কা বিজয়ের পর মহানবী (সা) কাবা শরীফের চাবি বনি সাইবা গোত্রের উসমান বিন তালহা (রা) -এর কাছে অর্পণ করেন। এখনো কাবা ঘরের

চাবি এই পরিবারের কাছেই আছে, এবং মহানবী (সা) -এর সালামের নির্দেশ অনুযায়ী কেয়ামত পর্যন্ত চাবিটি তাদের কাছেই থাকবে।পবিত্র কাবা ঘর থেকে মাত্র ২১ মিটার দূরত্বে অবস্থিত আল্লাহর কুদরতের বাস্তব নিদর্শন ‘জমজম কূপ’। জমজমের এক ফোঁটা পানির যে খনিজ গুনাগুন আছে, তা পৃথিবীর অন্য কোন

পানিতে নেই। ল্যাবরেটরীতে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, পৃথিবীর সাধারণ পানির তুলনায় জমজমের পানি এক হাজার গুন বেশি বিশুদ্ধ। পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা পানির উৎস জমজম কূপ সম্পর্কে জানাবো আমাদের পরবর্তী প্রতিবেদনে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close